রেযওয়ানুল বারী

ইতিহাস সাক্ষী যখনই কেউ অন্যায়ভাবে মানুষকে পরাধীনতার সৃঙ্খলে অাবদ্ধ করার অপ্রচেষ্টা করেছিল, বাক স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে যুলুম, নির্যাতনের হীন ষড়যন্ত্র করার অপ প্রয়াস চালিয়ে ছিল, সত্য, ন্যায়ের প্রতিবাদী কন্ঠকে স্তব্দ করে দেওয়ার ঘৃণ্যচেষ্টা করেছিল ঠিক তখনই আহলে ইলম উলামায়ে কেরাম গর্জে উঠেছিলেন,বুকের তাজা রক্ত দিয়ে পরাধীনতার সৃঙ্খল ভেঙ্গে দিয়ে মানুষকে স্বাধীন মুক্ত জীবনের পথ দেখিয়েছিলেন , স্বাধীনভাবে মাথা উচু করে বাচতে শিখিয়েছিলেন!

হাজ্জাজ বিন ইউছুফ থেকে শুরু করে উপমহাদেশ থেকে ইংরেজ খেদাও আন্দোলন পর্যন্ত আহমদ ইবনে হাম্বল, মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহঃ এর মত উজ্জল দৃষ্টান্ত গুলো আজ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত!

দীর্ঘ ২০০শত বছর ইংরেজদের অবৈধ শাসনে মানুষ যখন ইংরেজদের গোলামে পরিণত হয়েছিল, স্বাধীনতার কথা একেবারেই ভুলেই গিয়েছিল, মানুষ যখন হতাশায়, নিরাশায় এই ভেবে ইংরেজদেরকে প্রভু মেনে নিয়েছিল যে “ইংরেজদের পরাধীনতার সৃঙ্খল থেকে আর কখনো বের হতে পারবনা, উপমহাদেশে আর কখনো স্বাধীনতার সূর্য উধিত হবেনা!

ঠিক তখনই শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলবী রহঃএর হিন্দুস্তানকে দারুল হরব ঘোষণার মধ্য দিয়ে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে উপমহাদেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ বেনিয়াদেরকে!  উদিত হয়েছে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য! স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যটি যখন উদিত হয়েছে তখন উপমহাদেশের মানুষ দেখতে পেয়েছিল দিল্লির গ্রান্ড ট্যাঙ্ক

রোডে ৪০হাজার আলেমের গাছের সাথে ঝুলন্ত লাশ! আহলে ইলমের লাশ! উলামায়ে কেরামের লাশ!

এর পরে ইসলামী আইন বাস্তবায়নের লক্ষে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ১৯৪৭ সালে শাব্বীর আহমদ উসমানী, জাফর আহমদ উসমানী, আশরাফ আলী থানবীর নেতৃত্বে উলামায়ে কেরাম পাকিস্তান স্বাধীন করেন!
এতেও উলামায়ে কেরামের অনন্য ভূমিকা ছিল!

কিন্তু পাকিস্তানের শাসকরা আলেম উলামাদের সকল  আশা আকাঙ্খা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে শুরু করেছিল জুলুম নির্যাতনের শাসন! শুরু করেছিল পুর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর নির্যাতনের স্ট্রিম রোলার!

ফলে পুর্ব পাকিস্তানের জনগন গর্জে উঠেছিল, এবং অধিকার আদায়ের এক রক্তক্ষয়ি সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীন করেছিল বাংলাদেশ নামকএই ভুখন্ডকে ৷

কিন্তু অত্যান্ত আফসোসের বিষয় হলো ইতিহাসের এই জায়গাটা আজ ক্ষত বিক্ষত, ১৯৭১সালের মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের অগ্রগামী ভূমিকার যে ইতিহাস তা যেন ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে ৷

জলন্ত ইতিহাসকে অস্বীকার করে আলেম সমাজকে আজ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠি হিসেবে আখ্যায়িত করার অপ্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে ৷

অথচ ১৯৬৬ সালে শেখ মুজীবের ৬দফা দাবীকে পাকিস্তান সরকার যখন ইসলাম বিরোধী বলে প্রচারণা চালাতে লাগল ঠিক তখনই আওমীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা ওলিউর রহমান সাহেব গর্জে উঠে ফতওয়া দিয়েছিলেন “৬দফার সাথে ইসলামের কোনো বিরোধ নেই বরং ৬দফা ন্যায়সঙ্গতই হয়েছে!

এই ফতওয়ার অপরাধে পাকহানাদার বাহিনী মাওলানা ওলিউররহমান কে নির্মমভাবে শহীদ করে পরবর্তিতে তার ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত লাশ রায়ের বাজার পাওয়া যায় ৷

এবং মুক্তিযুদ্ধকে যখন অনেকে মুসলমান মুসলমানের সাথে যুদ্ধ ধারণা করে যুদ্ধে বের হতে ইতস্তবোধ করছিল, তাদের উদ্দেশ্যে হাফেজ্জী হুজুর রহঃ এবং ইমদাদুল হক আড়াইহাজারী রহঃ এক যোগে দ্ব্যর্থ কন্ঠে ঘোষণা করছিলেন “এ যুদ্ধ ইসলাম এবং কুফরের যুদ্ধ নয়, এ যুদ্ধ জালেম আর মাজলুমের যুদ্ধ, আমরা মাজলুম তারা জালেম, এবং হুব্বুল ওয়াতান মিনাল ঈমান বলে দীপ্ত ঘোষণা দিয়ে সকলকে যুদ্ধে শরীক হওয়ার আহ্বান জানান ৷

শাইখুল ইসলাম আল্লামা আমীমুল ইহসান রহঃ ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ফতওয়া দিয়েছিলেন

শেখ মুজীবের ৭ই মার্চ ভাষণের পরে ৯ই মার্চ দেওবন্দের বীর সন্তান মাওলানা আব্দুল হামীদ খান ভাষাণী পল্টন ময়দানে পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি বলেছিলেন “অনেক হয়েছে আর নয়, তিক্ততা বাড়িয়ে লাভ নেই, লাকুম দীনুকুম,,,,,,,,সুতরাং পুর্ব বংলার স্বাধীনতা স্বীকার করে নাও, মনে রেখো! সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারবেনা ৷

তিনি মাও সেতুং ও চৌ এন লাই এর কাছে পাকহানাদারবাহিনী কর্তৃক গনহত্যার বিবরণ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন ৷

কচুয়া মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা মুখলিছুররহমান ১৯৭১সালের ৭ই ডিসেম্বর পাকহানাদারদের পরাজিত করে স্বাধীন করেছিলেন কুমিল্লার চান্দিনাকে ৷ তার কাছে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়েছিল ১৩৯৫জন পাকিস্তানী আর্মি ৷

জিয়াউররহমানকে আশ্রয় ও মুক্তিযুদ্ধাদের অস্থায়ী ক্যাম্প বানানোর অপরাধে১৯৭১সালের ১৭ই এপ্রিল  চট্রগ্রামের পটিয়া মাদরাসাকে পাকহানাদারবাহিনী বোম মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল, নির্মমভাবে শহীদ করছেন পটিয়া মাদ্রাসার মোহতামিম আল্লামা দানেশ রহঃ কে এবং কারী জেবুল হাসান রহঃ কে ৷

ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহঃ এর বাড়ি ছিল মুক্তিযুদ্ধাদের আশ্রয় কেন্দ্র।

বাংলাদেশের জমিয়তে উলামা সংগঠনটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সর্বচ্চ ভূমিকা রেখেছিলেন ৷

এছাড়াও মাওঃ লুৎফররহমান বরুনী, কাজী মুতাসিম বিল্লাহ, মুফতী নুরুল্যাহ, ইমদাদুল হক আড়াইহাজারী, চোরমনাইর পীর সাহেব ফজলুল করীম রহঃ শামসুদ্দীন কাসেমী, মহিউদ্দীন খান সহ অনেক উলামায়ে কেরাম অস্ত্র হাতে নিয়ে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অবতির্ণ হয়ে ছিলেন, স্বাধীন করেছিলেন এই বাংলাদেশকে ৷ তারা কোনো সুনাম খ্যাতি চান নাই, তারা চেয়েছিলেন আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি৷

আজকে যারা আলেম সমাজকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠি বলে অাখ্যায়িত করার চেষ্টা করছে, তাদের কে শুধু এতটুকু বলব যে, আলেম সমাজ যদি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী হত তাহলে কস্বীন কালেও বাংলাদেশ স্বাধীন করা সম্ভব হতনা ৷আলেমরা ভুমিকা রাখছে বলেই দেশ স্বাধীন হয়েছে ৷

অবাক করা বিষয় হলো, যারা আজকে আলেম সমাজকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠি বলে আখ্যায়িত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের হাতে আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ক্ষতবিক্ষত ৷ বিদেশী প্রভুর গোলামী, দুর্নিতি, জনগনকে চুষে ফেলার মত মুক্তিযুদ্ধ বহির্ভুত কাজ গুলো করে যাচ্ছে ৷অথচ আলেম সমাজ এখনে মুক্তিযুদ্ধের স্বকিয়তা বজায় রেখেছেন, এবং প্রতি সপ্তাহে লক্ষ কোটি মিম্বর থেকে আলেম সমাজই স্বাধীনতার কথা বলে যাচ্ছেন ৷

কারণ আমরা জানি এদেশ আলেম উলামাদের তাজা রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে, এদেশের বালুকোনা থেকে এখনো আমাদের আকাবিরদের রক্তের ঘ্রাণ পাওয়া যায় ৷

সুতরাং আর মিথ্যা বানোয়াট ইতিহাস নয়৷ জানাতে হবে বর্তমান প্রজন্মকে সত্য ইতিহাস, আলেম উলামাদের ইতিহাস, স্কুল কলেজ ভার্সিটি সহ সবকিছুতেই প্রবেশ করাতে হবে উলামায়ে কেরামের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সত্য ইতিহাসের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে আমাদের প্রজন্মকে।

Share This Post