আব্দুল্লাহ আল মুবিন।। বাতায়ন। একটি শিল্প, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। ‘নয়া যামানার রূপায়ণ’ শ্লোগান নিয়ে ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর অপরাহ্নে যার শুভযাত্রা হয়। দেশব্যাপী কার্যক্রমের স্বপ্ন নিয়ে সিলেটের জৈন্তাপুরের দরবস্ত এলাকা থেকে যাত্রা করা এই বাতায়ন অল্পদিনেই উত্তরপূর্ব সিলেটে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। বাতায়ন এখন গণমানুষের আস্থা ও ভালোবাসার ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম। শুরু থেকেই বাতায়ন শিক্ষা ও সমাজসেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। সৃজনশীল কাজে বিশ্বাসী এই প্লাটফর্মে স্কুল-মাদরাসা পড়ুয়া একঝাঁক উদ্যমী তরুণ ছাড়াও যুক্ত আছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টানা রাতদিন চালিয়ে যাচ্ছে কার্যক্রম। বাতায়নের সকল কার্যক্রমের গভীর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) এর সাবেক ডীন, এমআইএসটি গাজীপুরের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, প্রফেসর, ডক্টর, ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান স্যার। তিনি বলেন- “আমি বাতায়নের দ্বিতীয় মেধাবৃত্তি পরীক্ষার বৃত্তিপ্রদান অনুষ্ঠানে চিফ গেস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। বাতায়নের চলমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে। তাদের চিন্তা-চেতনাকে আমি গভীরভাবে পাঠ করে বুঝতে পারলাম আমার সাথে বেশ মিল রয়েছে। টেকসই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে মুসলিম উম্মাহকে মর্যাদার আসনে সমাসীন করাই আমাদের লক্ষ্য। এরপর থেকে আমি তাদের সকল কার্যক্রমকে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করি। বাতায়ন এগিয়ে যাক। শুভ কামনা।” করোনাকালের সূচনালগ্ন থেকেই বাতায়ন গণমানুষের জন্য কাজ করে আসছে। ঘোষণা করেছে “ক্যাম্পেইন ফর কোভিড-১৯”। এই ক্যাম্পেইনের আওতায় পুনর্গঠন করেছে “বাতায়ন স্বেচ্ছাসেবক টিম”। সিলেটের প্রায় উপজেলায় এই টিমের শাখা বিস্তৃত। গত ৩১ মার্চ থেকে এই টিম মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল, বাজার ও সরকারি-বেসরকারি অফিস-স্থাপনায় এবং রাস্তায় চলাচলরত গাড়িতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জীবাণুনাশক দ্রবণ স্প্রে করে আসছে। চালিয়ে আসছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানও। “বাতায়ন মেডিকেল গ্রুপ” এর সৌজন্যে বিতরণ করেছে সচেতনতামূলক লিফলেট। ফার্মেসি ও মুদি দোকানের সামনে এঁকেছে নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিতকরণ বৃত্ত।

এরই সাথে করেছে বাতায়নিয়ানদের নিজস্ব তহবিল “কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি ফান্ড” থেকে বিপর্যস্ত পরিবারে খাদ্য সহায়তা। রমজানের শুরুতে বাতায়ন নিম্ন আয়ের পরিবারে বিতরণ করে ভিটামিন-সি জাতীয় সবজিসাগমগ্রী। ঈদ পর্যন্ত হাজারো পরিবারে অব্যাহত থাকে নগদ অর্থ ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম। লকডাউনের প্রভাবে জনজীবন প্রায় স্তব্ধ। সংকটময় এই পরিস্থিতিতে প্রতিবছরের ন্যায় “ঈদ প্রজেক্ট বাই বাতায়ন” কর্মসূচিটিও আয়োজিত হয়। এই কর্মসূচির আওতায় জৈন্তাপুর উপজেলার দু’টি বিপর্যস্ত বেদে পল্লীতে বাতায়ন স্বেচ্ছাসেবক টিম পৌঁছে দেয় ঈদ উপহার। উপযুক্ত প্রাপক নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কর্তৃক তৈরিকৃত প্রধানমন্ত্রীর ২৫০০টাকা ঈদ উপহারের তালিকাংশও যাচাই-বাছাই করে উপজেলা প্রশাসনের হাতে তুলে দেয় এই টিম। রোজা রেখে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিমের স্বেচ্ছাসেবকরা গুরুত্বপূর্ণ এই কাজটি আঞ্জাম দেওয়ায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়।শুধু তাই নয়, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার মনিটরিং, শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ, সেনাবাহিনীর সাথে কৃষকদের মাঝে বীজ বিতরণ, ন্যায্যমূল্যে টিসিবি’র পণ্য বিতরণ মনিটরিং ও সরকারী ত্রাণ বিতরণেও সহায়তা করে আসছে। উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন অধিদফতর বিশেষ করে সমাজসেবা অধিদফতর, কৃষি অধিদফতর, জনস্বাস্থ্য অধিদফতর এমনকি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথেও কোওর্ডিনেট করে করোনাভাইরাস সৃষ্ট সামাজিক সংকট নিরসনে ফ্রন্টলাইনে কাজ করেছে বাতায়ন। ঈদ পরবর্তী অধিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত জৈন্তাপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে জনস্বাস্থ্য অধিদফতর প্রদত্ত পানি বিশুদ্ধিকরণ ঔষধও বিতরণ করে ঘরে ঘরে গিয়ে।এজন্য বাতায়নকে অভিনন্দন জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব নাহিদা পারভীন মহোদয় বলেন- “আমার কাছে বাতায়ন অসাধারণ এক প্লাটফর্ম। ইতোমধ্যে বাতায়নকে যে কাজই দিয়েছি তারা তা সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বরাদ্দকৃত ঈদ উপহার প্রাপ্তদের তালিকা যাচাই-বাছাইয়ে তারা অনেক কষ্ট করেছে৷ রাত-দিন এক করে কাজ করেছে। করোনা পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাতেই হয়।” এই টিমের অসংখ্য কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম করোনায় মৃতদের জানাযা ও দাফনকাজ। গত ২৭ মে জৈন্তাপুর উপজেলায় প্রথম করোনায় মৃত্যুবরণ করেন আবুল হোসেন নামের একজন ইউ/পি সচিব। দাফনকাজে উপজেলা প্রশাসনের সাথে ছিল টিমের স্বেচ্ছাসেবকরা। ধারাবাহিক কার্যক্রমের মধ্যে সহসাই বাতায়ন পরিবারে নেমে আসার চেষ্টা করে শোকের ছায়া। বাতায়ন স্বেচ্ছাসেবক টিম’র চিফ কোওর্ডিনেটর, বাতায়ন’র প্রধান পরিচালক, সিলেটের দৈনিক শুভ প্রতিদিন’র (ধর্ম ও জীবন) বিভাগীয় সম্পাদক, জৈন্তাপুর অনলাইন প্রেসক্লাব’র কোষাধ্যক্ষ রাসেল মাহফুজ ও বাতায়ন স্বেচ্ছাসেবক টিম’র কোওর্ডিনেটর, বাতায়ন’র অতিরিক্ত সচিব (শিক্ষা), চারিকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোঃ সাজ উদ্দিন সাজু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। স্বভাবতই তখন বাতায়ন পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসার কথা ছিল। কিন্তু বাতায়ন প্রধানের সুদৃঢ় মনোবল আর অসাধারণ অনুভূতি সেই ছায়া নেমে আসতে অন্তরায় সৃষ্টি করে। তিনি তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেন- “প্রিয়দের বলছি, চিন্তার কোন কারণ নেই, অশান্ত হওয়ারও প্রয়োজন নেই, আতঙ্কিত হয়ে কোন লাভ নেই। করোনা ধীরেধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। আমরা আল্লাহর পথে আছি। আল্লাহর ফয়সালাই আমাদের জন্য কল্যাণকর। দোয়ায় শরিক রাখবেন সবাই। এইসময়ে দোয়াই সবচে’ বড় পুঁজি”। এরপর সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। সুস্থ বাতায়নিয়ানরা চালিয়ে যায় ধারাবাহিক কার্যক্রম। আয়োজন করে ‘খতমে কুরআন মজলিস’র। এই কর্মসূচি এখনো অব্যাহত আছে। একইসাথে ‘বিসিএইচসি’ ও ‘এবিজি’ নামে গ্রহণ করে নতুন দু’টি উদ্যোগও।For the people’s বা ‘গণমানুষের জন্য’ শ্লোগানকে সামনে রেখে গঠন করে (Batayon Covid-19 Healthcare Centre- BCHC) “বাতায়ন কোভিড-১৯ হেলথকেয়ার সেন্টার”। বিসিএইচসি করোনাভাইরাস আক্রান্ত কোভিড-১৯ রোগীদের মনোবল বাড়ানো, তাদের পরিবারকে অভয়দানসহ তাদের স্বাস্থ্য ও আর্থিক সহযোগিতায় নিবেদিত থাকবে। এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আছেন সিলেট উইমেন্স নার্সিং কলেজের ক্লিনিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর, বাতায়ন সচিব ও বাতায়ন স্বেচ্ছাসেবক টিমের কোওর্ডিনেটর ফজলে রাব্বী সাজু। For the student’s বা ‘শিক্ষার্থীদের জন্য’ শ্লোগানকে সামনে রেখে গঠন করে (Admission Guideline Wing of Batayon- AGB) “এডমিশন গাইডলাইন উইং অফ বাতায়ন”। উইংটি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি সংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের স্বপ্নসিঁড়ির ভূমিকা পালন করবে। এই উইং চায় মানবসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করে বিশাল মানবশক্তি গড়ে তুলতে। করোনা বিপর্যস্ত অসংখ্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো এই সংগঠনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে পাওয়া যায় চমৎকার একটি আহ্বান- “শুধু ত্রাণ-সহায়তা নয় স্বনির্ভর জাতিগঠনেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানায় বাতায়ন।” এব্যাপারে বাতায়ন সমন্বয়ক লুৎফুল করিম রাজ্জাকের ভাষ্য হচ্ছে- “জনসাধারণকে তো আহ্বান জানাচ্ছিই এমনকি আমরা নিজেরাই পড়ালেখার পাশাপাশি কৃষিকাজে মনোনিবেশের পরিকল্পনা করছি।” এই পরিকল্পনা চূড়ান্তের দিকে এগিয়ে নিতে বাতায়নকে উৎসাহ যোগায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। উপজেলা প্রশাসনের এসিল্যান্ড স্যারের মাধ্যমে তারা বাতায়নকে প্রদান করে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির বীজ। বাতায়নের এসব কার্যক্রমে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন উপজেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) জনাব ফারুক আহমেদ মহোদয়। তিনি বলেন- “সিলেটে অনাবাদী ভূমির অভাব নেই। অভাব শুধু মানুষের উদ্যোগের। কৃষিকাজে বাতায়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। এছাড়াও প্রশাসনের বিভিন্ন কাজে বাতায়ন সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। জনগণের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে একপর্যায় বাতায়নের প্রধান পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব (শিক্ষা) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের আন্তরিক দোয়া ও সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছি। বাতায়নের মতো সংগঠনের এই সমাজে বড় প্রয়োজন। এই তো এখনি বাতায়নকে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কাজে সহযোগী হিসেবে পেলাম। ‘মুজিববর্ষে দেশে কেউ গৃহহীন থাকবেনা’ প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার আলোকে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের নির্ভুল তালিকা চূড়ান্তের কাজটি আশাকরি তারা সুসম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।” বাতায়ন যে শুধু করোনাকালেই অব্যাহত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, এমন নয়। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই শিক্ষা ও সমাজসেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বাতায়ন প্রতিবছর যে মেধাবৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন করে তা উত্তরপূর্ব সিলেটে নজিরবিহীন। তালিকাভুক্ত ৪৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ৬ শতাধিক শিক্ষার্থী সেই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এছাড়াও নিয়মিত ‘সাপ্তাহিক আসর’ আয়োজন, ‘আসর আলো’ নামে দেয়ালিকা প্রকাশ, ‘আলোকায়ন’ নামে নতুন চিন্তার বাংলায়ন ম্যাগাজিন প্রকাশ, ‘মুক্ত বাতায়ন’ নামে বার্ষিক স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ, বিভিন্ন প্রতিযোগিতাসহ ব্যাপক কর্মসূচির মধ্য দিয়েই শেষ হয় বাতায়নের একেকটি বছর। বাতায়নের রয়েছে স্থায়ী একটি পাঠাগার, অস্থায়ী একটি উন্মুক্ত পত্রিকা পাঠ্যালয় কেন্দ্র, একটি নিজস্ব শিল্পীগোষ্ঠী, একটি মেডিকেল গ্রুপ। এছাড়াও রয়েছে ‘এসএসবি একাডেমি’ নামের একটি স্টুডেন্টকেয়ার সেন্টার। বাতায়নের চলমান ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্বন্ধে অবগত ওমর বিন খাত্তাব রা. তাহফিজুল কুরআন মাদরাসা ভৈরবের পরিচালক, জনপ্রিয় পাবলিক স্পিকার মুফতি জাবের মোহাম্মদ আজহার সোশ্যাল মিডিয়ায় বাতায়নকে নিয়ে প্রায়ই আশাবাদ প্রকাশ করেন। এই আশাবাদের কারণ জানতে চাইলে বলেন- “আমি বাতায়ন অফিস পরিদর্শন করেছি। তাদের কার্যক্রম আমি গভীরভাবে দেখেছি ও জেনেছি। আমার কাছে ভালো লেগেছে। উম্মাহর কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণদের নিয়ে স্বপ্ন দেখি। বাতায়নে যেভাবে আছেন কওমি মাদরাসা পড়ুয়া, ঠিক তেমনি আছেন সরকারি মাদরাসা ও স্কুলকলেজ এবং ইউনিভার্সিটি পড়ুয়ারাও। তাদের ভাষায় ‘বিভিন্ন স্রোতের অনন্য মোহনা’ দেখেই আমি আশান্বিত হই। বাতায়ন হোক গভীর নিদ্রায় নিমজ্জিত উম্মাহর জাগরণী কাফেলা।”

Share This Post