আল্লামা উবায়দুর রহমান খান নদভী

পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতের উদ্ধৃতি, অনুবাদ ও মহান আল্লাহর রহমত কামনা করে দোয়ার মধ্য দিয়ে গত বৃহস্পতিবার সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। করোনাভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণের মধ্যে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতি অনুসরণ করে এবং সম্পূর্ণ নয়া আমেজে অনুষ্ঠিত এ সংসদ অধিবেশনে এই বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি। এবারের বাজেট উপস্থাপনকালে সংসদের পরিবেশে যেমন ছিল ভিন্ন, তেমনি বাজেট বক্তৃতায়ও ছিল বিশেষ অভিনবত্ব। করোনার কারণে বাজেট বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করা হয়। সামান্য কিছু বক্তব্যের পর পুরো বাজেট বক্তৃতাটি পঠিত বলে গণ্য করা হয়। আর অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতার একটি বড় অংশ উপস্থাপিত হয় ডিজিটাল মাধ্যমে। এর বাইরে এবারের বাজেট বক্তৃতায় সুন্দর যে উদাহরণটি সৃষ্টি হয়েছে সেটি হলো মহাগ্রন্থ আল কোরআনের বিভিন্ন উদ্ধৃতি। এছাড়া অর্থমন্ত্রীর কণ্ঠে চলমান করোনা দুর্যোগ থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়ার বিনীত প্রার্থনার বিষয়টিও দৃষ্টি কেড়েছে সবার।

বাজেট বক্তৃতায় চলমান করোনা মহামারীকে অর্থমন্ত্রী আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য কঠিন পরীক্ষা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর সপক্ষে তিনি সুরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াত উপস্থাপন করেন, যেখানে বলা হয়েছে, ‘এবং অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।’ তিনি একই সুরার ১৮৫ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে আল্লাহ যে মানবজাতির জন্য সহজ চান, জটিলতা চান না সে কথাটিও উল্লেখ করেন ।

এছাড়া ৩০ পারার সুরা ইনশিরাহ’র ৫ ও ৬ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে বান্দাদের প্রতি সর্বশক্তিমান আল্লাহর দেয়া আশার বাণীও শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সেই আয়াত দুটিতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিঃসন্দেহে কষ্টের পরেই স্বস্তি রয়েছে।’

প্রতি বছর জুন মাসে বাজেট দেয়া হয়। ১০/১২ বার বাজেট দিয়ে ইতিহাস গড়া জাঁদরেল অর্থমন্ত্রীদের বাজেট বক্তৃতাও আমরা অনেক শুনেছি। কিন্তু পবিত্র কোরআনুল কারিমের এতো উদ্ধৃতি আর কোনো বাজেট বক্তৃতায় ছিল বলে মনে পড়ে না। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের বাজেট বক্তৃতায় কোরআনের উদ্ধৃতি থাকাই স্বাভাবিক। এটি বিস্ময়কর কিছু না।

তবে এ কালচার না থাকায় এবারের করোনাকালের বাজেট বক্তৃতা সবার দৃষ্টি কেড়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় বিষয় ।
অর্থমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে কোরআন তিলাওয়াত, স্টাডি ও এর বাণীর চর্চা করেন। তিনি তার বক্তৃতায় প্রায়ই কোরআন হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। মিডিয়ার লোকজন জানেন, অর্থমন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রোগ্রামেও মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রায়ই কোরআনের আলোচনায় চলে যান। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতি গতিশীল ও স্বাবলম্বী করতে জাকাতের ব্যাপারে তিনি সব সময় জোর দিয়ে থাকেন।

অনেকের মতো রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা পদ্ধতি এবং পারিপার্শ্বিকতা থেকে বহু সীমাবদ্ধতা সত্তে¡ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কোরআনের প্রতি একধরনের অনুরাগ, অনুভূতি ও গভীর শ্রদ্ধা ভালোবাসা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা সংসদে স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি কর্তৃক কোরআনের আয়াতের তিলাওয়াত, উদ্ধৃতি, দোয়া, মুনাজাত ইত্যাদি খুবই ইতিবাচক ও আন্তরিকভাবে নিয়ে থাকেন।
বাজেট বক্তৃতা শেষ করার আগে মহান আল্লাহর দরবারে অর্থমন্ত্রীর বিনীত প্রার্থনাও দেশবাসীর দৃষ্টি কেড়েছে। তিনি বারবার দোয়া করেছেন, ‘ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম বি রাহমাতিকা নাসতাগিস।’ হে সব কিছুর মূল নিয়ন্ত্রণকারী চিরন্তন আল্লাহ! আপনার রহমতের ওপর ভরসা করে আপনার সাহায্য প্রার্থনা করছি। হে আমাদের প্রভূ! আপনার রহমত থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না। তিনি বাজেট বক্তৃতায় সূরা মুলুকের প্রথম অংশ, তাবারাকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুলক। ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শায়্যিন কাদির পাঠ করেন। এরপর মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা. সহ দুনিয়ায় আগত সকল নবী রাসূলগণের ওপর দুরূদ ও সালাম, সালামুন আলাল মুরসালিন বলেন। আর সবশেষে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রশংসা ও শোকরিয়া আদায় করেন, ওয়ালহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন পাঠের মধ্য দিয়ে, যা একটি সম্পূর্ণ মুনাজাত। তিনি আল্লাহর দরবারে করোনার দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠে একটি সুন্দর সকালের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তার স্মরণীয় ও সুন্দরতম বক্তৃতাটি সমাপ্ত করেন। কোরআন গবেষক অর্থমন্ত্রী এর মধ্যদিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন মেজাজের বাজেট পেশ করেন।
মূলত করোনার ভয়াল থাবা সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মনোজগতেও ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাকালে বিভিন্ন প্রোগ্রামে করোনার কাছে পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর অসহায়ত্ব তুলে ধরেন। আল্লাহর এই আজাবের সামনে মানুষ কতটা শক্তিহীন সে বিষয় অকপটে স্বীকার করেন। সরকার প্রধান সবসময় এই বিপদ থেকে রক্ষার জন্য দেশবাসীকে আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি প্রার্থনার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
গত এপ্রিলে অল্প সময়ের জন্য বসা জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকারের নেতৃত্বে সংসদ সদস্যরা দোয়া ও তওবা-ইস্তেগফার করেন। আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচার আকুতি জানান। গত ১০ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশনের শুরুর দিনেও এমপি হাফেজ মাওলানা রুহুল আমিন মাদানী পরিচালিত মোনাজাতে ছিল অনুশোচনার অশ্রু আর করোনার আজাব থেকে বাঁচার আকুতি। ৯২% মুসলমানের দেশের জাতীয় সংসদে করোনার কারণে আল্লাহর রহমত কামনা করে দোয়া হবে, এটাই কাম্য, এটাই স্বাভাবিক। যদিও নানা অজুহাতে তথাকথিত প্রগতিশীল চিন্তার লোকেদের এ নিয়ে মাথাব্যাথা আর আপত্তির শেষ নেই। হয়তো এ নিয়েও একশ্রেণির দালাল বুদ্ধিজীবী বিরূপ মন্তব্য করতে শুরু করবে। কোনো কোনো মার্কামারা মিডিয়া এ নিয়ে ঘটা করে সমালোচনার আয়োজন করে বসবে। তবে যে যাই বলে বলুক, ধর্মপ্রাণ মুসলমান সরকারের ভালো কাজের সমর্থন করেই যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন এবং বিপদ-আপদ দূর করে দেশ ও জাতিকে উন্নতি, সফলতা এবং শান্তি-সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করুন।
পাঠক নিশ্চয়ই জানেন যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের আবাসস্থল হিসাবে বাংলাদেশ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৭১-এ এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে দেশটি স্বাধীন বাংলাদেশের রূপ পরিগ্রহ করে। এরও বহু আগে ১২০৩ সালে এ ভূখন্ডে মুসলমানদের শাসন কায়েম হয়। এর
প্রধান নগরী ঢাকার সৌভাগ্য যে, এটি অন্তত ৫ বার নানা শাসনামলে রাজধানীর মর্যাদা প্রাপ্ত হয়। সুলতানী আমলে দ্বিতীয় ও কৌশলগত সামরিক রাজধানী, আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল আমলে ১৬০৮ সালে। এরপর বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাজধানী, ১৯৪৭-এ পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ও সর্বশেষ স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী।
দীর্ঘদিন যাবত এ রাজধানী শহরটি, যা বর্তমানে তিলোত্তমা মেগাসিটিতে রূপান্তরিত হয়েছে, বহুকাল ধরেই মসজিদনগরী বলে খ্যাত। মাদরাসা-মসজিদ ও কোরআনেরও শহর এটি। এ দেশের সংসদ অধিবেশনে কোরআন তিলাওয়াত একটি ঐতিহাসিক স্থান দখল করে আছে। ঐতিহ্য হিসাবে এটি দারুণ। সময়ের জনপ্রিয় দুই মহান কারী হজরত মাওলানা কারী মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ এবং হজরত মাওলানা কারী মুহাম্মদ ইউসুফ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রিয় মানুষ। আজ তাদের কেউই দুনিয়ায় নেই। তবে রয়ে গেছে তাদের পুণ্য স্মৃতি। রয়ে গেছে জাতীয় সংসদ ও কোরআন তিলাওয়াত।
আমাদের সংসদ ভবন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন। মার্কিন স্থপতি লুই কান যখন এর নকশা করেন তখন এতে মসজিদ ছিল না। তৎকালীন স্পিকার মৌলবী তমিজউদদীন খান এ নকশায় মসজিদ সংযুক্ত করার নির্দেশ দেন। তৈরি ও পূর্ণাঙ্গ নকশায় নতুন করে মসজিদের জায়গা করা এবং নকশা নিখুঁত রেখে মসজিদ বসানো ছিল লুই কানের জন্য কঠিন পরীক্ষা। বড় সমস্যা দেখা দিল, কিবলা ঠিক করে মসজিদ বানালে গোটা সংসদ ভবনটি বানাতে হবে আগের পরিকল্পনার তুলনায় বহু ডিগ্রি বাঁকা করে। স্পিকার তমিজউদদীন খান বললেন, মুসলমানদের পার্লামেন্ট হাউস। মসজিদ বাঁকা করা চলবে না। কিবলাও ঠিক রাখতে হবে আর মসজিদটিও হতে হবে সোজা সোজা কাতারের। প্রয়োজনে সংসদ ভবনটি বাঁকা করে নির্মাণ করা হবে কিন্তু মসজিদ থাকতে হবে সঠিক ডাইরেকশানে এবং সোজা কাতারের। যে কথা সেই কাজ।
বিস্ময়কর ব্যাপার মনে হলেও দর্শক লক্ষ করলে স্পষ্ট দেখতে পাবেন যে, আমাদের জাতীয় সংসদ ভবনটি লেকের ওপর বাঁকা করে নির্মাণ করা হয়েছে। এর কারণ এটিই, যাতে এর ভেতরকার প্রধান মসজিদটি থাকে সোজা কাতারের এবং কিবলামুখী। এটি যখনকার ঘটনা তখন আমার একাধিক আত্মীয়-স্বজন এ দেশের প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্য। তারা এ ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। জাতীয় সংসদ ভবনের গঠন, অবস্থান ও বাস্তব রূপের পাশাপাশি আমাদের জাতীয় ইতিহাসও এর সাক্ষী হয়ে আছে। অতএব, এমন একটি কিবলা ও মসজিদকেন্দ্রিক ভবনের সংসদীয় কার্যক্রম ও অধিবেশনে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এবং দোয়া-মুনাজাত হবে, এটাই তো বিশ্বাস, চেতনা ও ঐতিহ্যের দাবি। ধন্যবাদ সংসদ নেতা ও তার সহকর্মীদের।

Share This Post