হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদী বলেছেন, পবিত্র রমজান মাসে গণগ্রেফতার বন্ধ করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজি। সমস্যা যত বড়ই হোক, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান বের করা যায়। হেফাজতের মধ্যেও যদি কেউ অপতৎপরতা চালায়, আমরা তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেব।

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে হেফাজত মহাসচিবের পুত্র মাওলানা মুর্শেদ নুর গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদী এসব কথা বলেন।

বিবৃতিতে সম্মতি জানিয়েছেন হেফাজতের সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী ও নায়েবে আমীর মাওলানা আবুল কালাম।

বিবৃতিতে হেফাজত মহাসচিব বলেন, হেফাজত শুরুর দিন থেকেই সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন। হেফাজতের কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। হেফাজতের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও নেই। হেফাজতের প্রধান প্রধান পদগুলোতে যারা রয়েছেন, তারাও সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বিশেষ করে বর্তমান আমীর আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী, প্রধান উপদেষ্টা আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং আমি, আমরা কখনই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না এবং বর্তমানেও নেই। হেফাজত শুধু দ্বীনি ইস্যুতে কর্মসূচি দিয়ে থাকে। এ যাবতকাল আমরা যতগুলো কর্মসূচি দিয়েছি, তার সবই দ্বীন ও দেশের স্বার্থে।

হেফাজতে ইসলাম দেশের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় অরাজনৈতিক আধ্যাত্মিক সংগঠন দাবি করে তিনি বলেন, আল্লামা আহমদ শফী এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। মৃত্যু অবধি তিনি এ সংগঠনের আমীরের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শাইখুল ইসলামের ইন্তেকালের পর তার এই মহান আমানত তার উত্তরসূরি ওলামায়ে কেরামের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি তারই দেখানো পথে এ সংগঠনকে পরিচালিত করতে।

তিনি বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে বলেন, দেশে বর্তমান যে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা তৈরি হয়েছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে কেন্দ্র করে। হেফাজত মোদির সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেছে। এটা কোনো রাজনৈতিক ইস্যু বা দেশ বিরোধিতা নয়। অতীতে অনেকবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। আমরা তখন বিরোধিতা করিনি। মোদির আগমন বিরোধিতার কারণ তার ইসলাম বিদ্বেষ।

তিনি আরও বলেন, মোদি এবং তার দল ভারতের মুসলমানদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালাচ্ছে। মসজিদ ভেঙে মন্দির নির্মাণ করছে। কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যা ও জনগণের অধিকার হরণ করছে। এসব কারণেই আমরা মোদির আগমনের বিরোধিতা করেছি। তবে সেই বিরোধিতা বক্তব্য ও বিবৃতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। হেফাজত মাঠের কোনো কর্মসূচি দেয়নি। বরং সংবাদ সম্মেলন করে হেফাজতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এ ইস্যুতে আমাদের কোনো কর্মসূচি নেই। বিশেষ করে ২৬ মার্চ দেশের কোথায় হেফাজতে ইসলামের কোনো কর্মসূচি ছিল না।

হেফাজত মহাসচিব বলেন, কিন্তু ২৬ তারিখ জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমে সাধারণ মুসল্লিদের সঙ্গে কিছু দুষ্কৃতকারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এতে সাধারণ মুসল্লিদের অনেকেই আহত হন। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ করে সাধারণ ছাত্র জনতা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হেফাজত দুই দিনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ২৭ মার্চ ছিল বিক্ষোভ সমাবেশ ও ২৮ মার্চ শান্তিপূর্ণ হরতাল।

হেফাজতের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করতে- এমনটা জানিয়ে তিনি বলেন, যেখানে যেখানে নেতারা উপস্থিত ছিলেন, সেখানে কোনোপ্রকার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি। তবে যেসব জায়গায় নেতারা সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি, এমন কিছু জায়গায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নই এসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে আসল ঘটনা কী! কারণ আমরা তো বারবার বলেছি আমাদের কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ। তাহলে কারা করল এসব বিশৃঙ্খলা! হতে পারে কোনো অপশক্তি তাদের হীনউদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হেফাজতের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অনুপ্রবেশ করেছিল এবং হেফাজত ও হেফাজতের নেতাকর্মীদের দায়ী করার জন্য নানান বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল।

তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করে বলেন, ২৬ তারিখ আমাদের কর্মসূচি ছিল না। বাইতুল মোকাররমে যারা বিক্ষোভ করেছে, তাদের সঙ্গে হেফাজতের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং ওই ঘটনায় পরিস্থিতি শান্ত করতে ভূমিকা রেখেছে হেফাজত। হেফাজতের দায়িত্বশীলরা সেদিন প্রশাসনের অনুরোধে মসজিদ থেকে বিক্ষোভরত মুসল্লিদের বের করে নিয়ে আসেন। হাটহাজারীতে যে বিক্ষোভ হয়েছে, সেটাও কেন্দ্র ঘোষিত কোনো কর্মসূচি ছিল না। সেটা ছিল ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ। শুক্রবার হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।

তাছাড়া ২৭ তারিখ বিক্ষোভ হেফাজতের ঘোষিত কর্মসূচি হলেও আমরা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত কর্মসূচি পালন করতে সক্ষম হয়েছি। দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া কোথাও কোনো ঝামেলা তৈরি করতে দেওয়া হয়নি। ২৮ তারিখ হেফাজতের হরতাল কর্মসূচি ছিল। বারবার সংবাদ সম্মেলন করে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। নেতারা মাঠে থেকে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেছেন। নেতারা থাকা অবস্থায় কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

হেফাজত মহাসচিব বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ কয়েকটি জায়গায় বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনার সঙ্গে হেফাজতের হরতাল কর্মসূচির সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না। ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসায় হামলা করায় বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ মাঠে নেমে আসে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

হেফাজত মহাসচিব আরও বলেন, আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাব, মাদ্রাসায় হামলা ও তৌহিদী জনতাকে উস্কানি দেওয়ার পেছনে।

Share This Post