গত ১৩ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নতুন একটি শিক্ষা কারিকুলামের খসড়া রূপরেখা অনুমোদন করেছেন৷ এই কারিকুলাম বাস্তবায়ন শুরু হবে ২০২৩ সাল থেকে ৷ এবং সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হবে ২০২৭ সালে৷

নতুন শিক্ষা কারিকুলামের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:
১৷ তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো ধরণের পরীক্ষা থাকবে না৷
২৷ এসএসসির আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা হবে না৷ পঞ্চম শ্রেণি ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে৷
৩৷ এসএসসির আগে সায়েন্স, মানবিক— এমন কোনো বিভাজন থাকবে না৷ সবাই অভিন্ন বিষয় পড়বে ৷ একাদশে গিয়ে বিভাগ আলাদা হবে৷
৪৷ এসএসসিতে পাবলিক পরীক্ষা শুধু এসএসসির সাবজেক্টের উপর ভিত্তি করেই হবে৷
৫৷ এইচএসসি নামে কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকবে না৷ একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির উভয় পরীক্ষা পাবলিক পরীক্ষা বলে বিবেচিত হবে৷
৬৷ প্রাথমিকে সাপ্তাহিক ছুটি একদিন এবং মাধ্যমিকে দুইদিন থাকবে।
৭৷ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন দশটি বিষয় পড়ানো হবে ৷ ১. বাংলা ২. ইংরেজি ৩. গণিত ৪. বিজ্ঞান ৫. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ৬. সামাজিক বিজ্ঞান ৭. জীবন ও জীবিকা ৮. ধর্ম শিক্ষা ৯. স্বাস্থ্য শিক্ষা ১০. এবং শিল্প ও সংস্কৃতি৷

কওমিরা যা করতে পারেন :
নতুন শিক্ষা কারিকুলামের পরিপ্রেক্ষিতে কওমি মাদরাসাগুলো তাদের শিক্ষা-কার্যক্রমে এসএসসিকে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে৷

কীভাবে করবে?
সকল কওমী মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি ও গণিত পড়ানো হয় ৷ কোনো কোনো মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্তও পড়ানো হয় ৷ এক্ষেত্রে তারা যদি আর দুটো বছর জেনারেল শিক্ষাটাকে ধরে রাখেন, তাহলেই এসএসসিতে পৌঁছে যাওয়া যায়৷
বেফাক শিক্ষা কারিকুলাম অনুযায়ী প্রথম বোর্ড পরীক্ষা হয় পঞ্চম শ্রেণিতে৷ এরপর এসএসি লেভেল পর্যন্ত আসতে আর পাঁচ বছর লাগে৷ এই সময়ে যে পাঁচটি ক্লাসে জেনারেল শিক্ষাটা কন্টিনিউ করতে হবে সেগুলো হলো— মীযানে ষষ্ঠ শ্রেণি, নাহুমীরে সপ্তম শ্রেণি, হিদায়াতুন্নাহুতে অষ্টম শ্রেণি, কাফিয়াতে নবম শ্রেণি এবং শরহে জামীতে দশম শ্রেণি৷

কাফিয়া এবং শরহে জামী— এই দুটো ক্লাস অনেক মাদ্রাসায় এক বছরে আর কিছু মাদরাসায় দুই বছরে পড়ানো হয়৷ শরহে জামী যাদের আলাদা, তাদের জটিলতা কম৷ শরহে জামীর বছরটাকে তারা এসএসির বছর বানিয়ে নিতে পারেন ৷ এ বছর পুরোদমে এসএসসির সিলেবাস পড়ানো হবে৷ সাথে শরহে জামী ক্লাসের মৌলিক দু-একটি কিতাব থাকবে ৷ যারা কাফিয়ার সাথে শরহে জামী পড়ে ফেলেন তাদের জন্য পরবর্তী বছরটা হবে শুধুই এসএসসির৷ সাথে শরহে জামী থেকে বাদ দেওয়া দু-একটি কিতাব আবার যুক্ত করা যেতে পারে৷

এসএসসির বছরের পর কেউ ইচ্ছা করলে কওমিতে শরহে বেকায়ায় ভর্তি হবেন৷ কেউ ইচ্ছা করলে জেনারেল প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভর্তি হবেন৷

কী লাভ হবে এতে?
১৷ বর্তমানে প্রচুর সংখ্যক মানুষ তাদের সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চান৷ তাদের অনেকে জাগতিক আশা ত্যাগ করে পূর্ণরূপে মাদ্রাসাকে বেছে নেন৷ আবার বহু অভিভাবক দেশের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়ে মাদ্রাসাকে গ্রহণ করতে পারেন না৷ মাদ্রাসায় এসএসসির অন্তর্ভুক্তি এই অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা দূর করবে৷ কওমিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পাবে৷

২৷ বিশ বছর পর দেখা যাবে দেশে এমন কোন সেক্টর নাই, যেখানে দু-চার দশজন মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের লোক নাই৷ এতে মাঠ লেভেলে ইসলাম ধর্ম প্রচুর শক্তি লাভ করবে৷

৩৷ এখন যারা জেনারেল শিক্ষা লাভ করেন, তারা ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন না ৷ আবার যারা ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন, তারা জাগতিক শিক্ষাটা পান না ৷ মাদ্রাসায় এসএসসির অন্তর্ভুক্তি এই সমস্যা দূর করবে৷

৪ ৷ জেনারেল শিক্ষার সুযোগ পেয়েও যারা আলেম হওয়ার পথ বেছে নেবেন, তারা প্রকৃতই আলেম হবেন৷ দায়ে পড়ে কারও মাদ্রাসায় থাকা লাগবে না৷ তখন হয়তো পথেঘাটে মুফতি পাওয়া যাবে না কিন্তু যারা মুফতি হবেন, তারা দক্ষ মুফতি হবেন৷

৫৷ বর্তমানে মাদ্রাসা-শিক্ষা পদ্ধতিতে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা লাভ করেন দেশের এক থেকে দেড় শতাংশ মানুষ৷ উপরিউক্ত পদ্ধতিতে আমরা সেটাকে অন্তত দশ থেকে বিশ শতাংশে উন্নীত করতে পারবো ইনশাআল্লাহ৷

৬৷ মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রমাণ করতে পারলে ভবিষ্যতে দেশে মূল শিক্ষা কারিকুলামটাই প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা কারিকুলামে পরিণত হতে পারে৷

৭৷ মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রচুর শিক্ষার্থী জেনারেল শিক্ষাঙ্গনে থাকার কারণে আলেমদের সম্পর্কে বহু মানুষের ভুল বোঝাবুঝি কমবে, আলেমবিদ্বেষ হ্রাস পাবে, দেশ ইসলামাইজেশনের দিকে এগিয়ে যাবে৷

বিকল্প প্রস্তাবনা:
১৷ কওমি মাদ্রাসাগুলো সাধারণভাবে এই প্রস্তাবনা গ্রহণ না করলে প্রাইভেট মাদ্রাসাগুলো এটি গ্রহণ করতে পারে ৷ এতে তাদের চাহিদা বাড়বে৷

২৷ কেউ ব্যক্তি পর্যায়েও এটি করতে পারেন৷ অনেকটা তাখাসসুস বিভাগের পদ্ধতিতে শুধু এসএসসি বিভাগ খুলতে পারেন৷ হিফজখানাগুলো এই সুবিধা কাজে লাগাতে পারে৷

Share This Post