Spread the love

ভাস্কর্য হচ্ছে ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির পরিচায়ক। মানুষের চিন্তাশক্তির সৃষ্টিশীলতার ক্যানভাস। এতে মনের মাধুরী মিশিয়ে তুলে ধরা হয় হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য। তাইতো পৃথিবীর বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ভাস্কর্য। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই আমাদের প্রাণের মাতৃভূমি। রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দেখা মেলে ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাক্ষী অসংখ্য ভাস্কর্যের। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ, ধর্ম ও সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত ভাস্কর্য কিংবা স্তম্ভগুলোর নান্দনিক রূপ হৃদয় ছুঁয়ে দেয় মানুষের মন।

দেশের এসব ভাস্কর্যের মধ্যে বেশকিছু ভাস্কর্যে ছড়িয়ে আছে ইসলামের আভা; যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হৃদয় কিছুটা হলেও আলোড়িত করে। মনে করিয়ে দেয় স্রষ্টা ও ধর্মপ্রেম। ইতিহাস ও ইসলামের মান উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দেশের এমন কিছু ভাস্কর্য নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন।

‘দ্য গ্লোরি অব নামিরা’

মহান আল্লাহর ৯৯ নাম সম্বলিত এটি রাজধানীর প্রথম ভাস্কর্য। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ৩৩নং ওয়ার্ডের সরকার দলীয় কাউন্সিলর তারেকুজ্জমান রাজিবের উদ্যোগে এটি মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ সংলগ্ন চৌরাস্তায় নিমার্ণ করা হয়।

‘দ্য গ্লোরি অব বঙ্গবন্ধু’

‘ঘর থেকে বের হয়েই যেন মানুষ আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে’ সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মোড়ে নির্মিত হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে আল্লাহতায়ালার ৯৯টি গুণবাচক নাম সম্বলিত ভাস্কর্য ‘দ্যা গ্লোরী অব বঙ্গবন্ধু’।

রায়েরবাজারে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ কবরস্থান নির্মাণ করে দেওয়ায় মোহাম্মদপুরবাসীর পক্ষে এই স্তম্ভটিও নির্মাণ করেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ৩৩নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারেকুজ্জমান রাজিব।

‘আল্লাহু চত্বর’ নরসিংদী

নরসিংদী সদরের রেল স্টেশন সংলগ্ন বিলাসদী এলাকায় নির্মাণ করা হয় দৃষ্টি নন্দন এ ভাস্কর্যটি। স্বর্ণপদক প্রাপ্ত নরসিংদীর সাবেক পৌর মেয়র শহিদ জনবন্ধু লোকমান হোসেন এটি নির্মাণ করেন। ভাস্কর্যটির উচ্চতা প্রায় পঞ্চাশ ফুট। মোহনীয় এ ভাস্কর্যটি দেখার জন্য প্রতিনিয়তই মানুষ সেখানে ভীড় করে থাকে।

‘আল্লাহু মুহাম্মদ ভাস্কর্য’

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ফেনীর রামপুর রাস্তার মাথায় ফেণি পৌরসভার অর্থায়নে তৈরি করা হয় দৃষ্টিনন্দন এ ইসলামি ভাস্কর্য। ১৪ ফুট উচ্চতার এ ভাস্কর্যটির নির্মাণ খরচ প্রায় ১০ লাখ টাকা। ফেনী পৌর মেয়র হাজি আলাউদ্দিন শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য  এ ভাস্কর্যটি তৈরি করেন।

কালেমা চত্বর

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে বাসস্ট্যান্ড মোড়ের ত্রিমোহনায় ৩১৫ ফুট স্থানজুড়ে ১৫ ফুট মাটির উঁচু ডিবির ওপর ১৭ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার এ ভাস্কর্যটি সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নির্মাণ করেন। এটি নির্মাণ করা হয় ১৯৯৮ সালে।  কিবলামুখী এ ভাস্কর্যে আকাশি রঙের টাইলসে ডিজাইন করা হয়েছে। প্রায় ২১ বছর আগে গড়ে তোলা ভাস্কর্য দেশের ইসলামি বাণীসমৃদ্ধ প্রথম ক্যালিগ্রাফি স্থাপনা বলে ধারণা করা হয়।

‘আল্লাহু চত্বর, কুমিল্লা’

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা সদরের জিরো পয়েন্টে পাথরে মহান আল্লাহর ৯৯ নাম খোদাই করে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হয় ভাস্কর্যটি। বাহারি আলোকসজ্জার কারণে দিনের চাইতে রাতে ভাস্কর্যটির সৌন্দর্য বেড়ে যায় কয়েকগুণ। যা দেখতে প্রতিদিনই ভিড় জমান দর্শনার্থীরা। ভাস্কর্যটি রক্ষণাবেক্ষণে আছে মুরাদনগর থানা পুলিশ।

বিসমিল্লাহ চত্বর

ভাণ্ডারিয়া-পিরোজপুর সড়কের চরখালী ফেরিঘাটের কাছে চৌরাস্তার মোহনায় ২০০০ সালে গড়ে তোলা হয় ইসলামী বাণীসমৃদ্ধ আরো একটি ভাস্কর্য। গোলাকৃতির রেলিংঘেরা প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার মিনার আকৃতির এ নির্মাণটি করা হয় সড়ক ও জনপথ বিভাগের অর্থায়নে। ভাস্কর্যটির মূল ডিজাইনের সঙ্গে একটি ফোয়ারা সংযোজিত রয়েছে। সেই সঙ্গে নানা বর্ণিল আলোকচ্ছটা সন্ধ্যায় অপূর্ব রূপ-আবহে মানুষকে বিমোহিত করে।

মাদানী তোড়ন

সিলেট শহরের নয়াসড়ক জামে মসজিদ সংলগ্ন পয়েন্টে উন্মুক্ত পরিবেশে নির্মাণ করা হয়েছে নান্দনিক এ ভাস্কর্য। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এটি নির্মাণ করেন।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার, ভারতের বিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক সদরুল মুদাররিসীন আওলাদে রাসুল সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানীর নামে ভাস্কর্যটির নামকরণ করা হয় ‘মাদানী তোড়ন’ ।

ছাগলনাইয়ায় আল্লাহ ও মুহাম্মদ সা: খচিত দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য

ফেণীর ছাগলনাইয়া পৌর শহরের জমাদ্দার বাজারে চৌরাস্তার জিরো পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে ভাস্কর্যটি। ছাগলনাইয়া  পৌর মেয়র মুহাম্মদ মোস্তফা এটি নির্মাণ করেন। ১৮ ফুট উচ্চতার নির্মিত এ ভাস্কর্যটির নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২২ লাখ টাকা। করোনা দুর্যোগের কারণে দৃষ্টিনন্দন এ ভাস্কর্যটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়নি।

সুবহানাল্লাহ চত্বর

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার পৌর শহর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ধাওয়া সড়কের ফুলতলা বাজারের ত্রিমোহনা সড়কে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন এ ভাস্কর্যটি। পিরোজপুর জেলা পরিষদের অর্থায়নে গড়ে তোলা মিনার আকৃতির এ ভাস্কর্যের নাম রাখা হয়েছে সুবহানাল্লাহ চত্বর। ২০১৭ সালে তৎকালীন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এটি নির্মাণ করেন।

প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার গোলাকৃতির স্তম্ভটি অনেকটাই মিনার বা গম্বুজ আদলে গড়া। নানা বর্ণিল টাইলসে গড়ে তোলা এই স্তম্ভটি নান্দনিক শোভা বর্ধন করেছে। তিনটি পিলারে গড়ে তোলা স্তম্ভটির নিচের মাঝখানে ছোট একটি স্তম্ভে স্টিলের হরফে লেখা রয়েছে আল্লাহু আকবার। আর তিনটি পিলারের নিচের অংশে লেখা রয়েছে আরবি ভাষায় আল্লাহর ৯৯ নাম।

সর্বপ্রথম আল্লাহর ৯৯ নামের ভাস্কর্য

মহান আল্লাহর গুণবাচক ৯৯ নামের ভাস্কর্য বাংলাদেশে সর্বপ্রথম নির্মাণ করেছে কুমিল্লার শবনম আর্ট হল। ২০১৬ সালের শেষ দিকে নির্মিত হয় এটি। কুমিল্লা শহরের ফৌজদারী মোড়ে আরবি হরফে পবিত্র কালিমা খচিত ফলকটির উচ্চতা ১৬ ফুট এবং ব্যাস ১০ ফুট। তিনটি স্তম্ভের মাঝখানে আল্লাহর ৯৯টি গুণবাচক নাম আরবি হরফের সাথে বাংলা উচ্চারণ অর্থসহ লিখা আছে এতে।এছাড়া ভাস্কর্যটির একেবারে ওপরের দিকে লেখা রয়েছ ‘আল্লাহু’  এবং এর নিচের অংশে রয়েছে ছয়টি আরবি ক্যালিওগ্রাফি।

শাহ গাজি সৈয়দ বুরহান উদ্দিন রহ. চত্বর

সিলেট নগরীর মেন্দিবাগ এলাকায় খাদিম সিরামিক্স এর অর্থায়নে নির্মাণ করা হয় এ ভাস্কর্যটি। সিলেট বিভাগের আদি মুসলিম শাহ সৈয়দ গাজি বুরহান উদ্দীনের নামে এর নাম করণ করা হয়। ভাস্কর্যটির সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ করছে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিজাইন আর্টিস্ট্রি’।

Share This Post